জহির রায়হানঃ আওয়ামী গুম রাজনীতির ইতিবৃত্ত


গত জুলাইয়ে Reporters Without Borders [RSF] নামে সাংবাদিকদের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের বর্তমান বিনাভোটে ‘নির্বাচিত’ ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে Predator নামে অবহিত করেছে।


যেখানে বলা হয়েছে তার প্রধান শিকার হচ্ছে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী। এর পাশাপাশি দেশে সরকারি রাষ্ট্রীয়বাহিনী এবং প্রশাসনের মাধ্যমে গুম-খুন আর ক্রসফায়ারের মাধ্যমে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন তিনি।

 

কিন্তু বাংলাদেশে কী তিনিই প্রথম; যিনি এমন গুম-খুন আর ক্রসফায়ারের মাধ্যমে আতংক আর ত্রাসের এক রক্তাক্ত উপত্যকার মৃত্যুপুরী গড়ে তুলেছেন? বাংলাদেশ কিংবা তার পরিবারে?

ইতিহাস কী বলে এ ব্যাপারে?

 

ইতিহাস বলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার অব্যাহতি পর থেকেই এই স্বাধীন ভূখণ্ডে গুম-খুন আর ক্রসফায়ারের এই মানবতাবিরোধী রাষ্ট্রীয় অপরাধের মারণসংস্কৃতির শুরু হয়েছে।

যার প্রথম শিকার হন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক, সাংবাদিক জহির রায়হান!*

 

[যদিও তারও আগে স্বাধীনতার মাত্র স্বাধীনতার ২ দিন পর সর্বপ্রথম গুম হন মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রস্তাবক নিউক্লিয়াসের স্বপন কুমার চৌধুরী। এর মাত্র ৮-১০ দিন পর নিখোঁজ হন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী ও মুক্তিযুদ্ধে মেজর জলিলের সহযোদ্ধা স্টুয়ার্ড মুজিব।]

 

 

জহির রায়হান একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক, সাংবাদিক এবং রাজনীতিবিদ।

১৯৩৫ সালে তিনি ফেনী জেলার মজিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলায় স্নাতক [সম্মান] ডিগ্রি অর্জন করেন। তার প্রকৃত নাম ছিল মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ।

অল্প বয়সেই মোহাম্মদ জরিহরুল্লাহ তৎকালীন পূর্ব বাংলায় কমিউনিস্ট রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন এবং রাজনীতিতে যোগ দেন। তখন কম্যুনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। তিনি কুরিয়ারের দায়িত্ব পালন করতেন। গোপন পার্টিতে তিনি ‘রায়হান’ নাম ধারন করেন এবং পরবর্তী জীবনে ‘জহির রায়হান’ নামে পরিচিত হন।

১৯৫২ সালে পূর্ব বাংলায় ভাষা আন্দোলনের সময় এই আন্দোলনের একজন কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন জহির রাহয়ান। ২১শে ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সালে যে ১০জন প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিদ্রোহ করেছিলেন তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। সেই দিন তাকে মিছিল থেকে গ্রেফতার করে কারারুদ্ধ করা হয়। ক্ষণজন্মা এই মানুষটি তার অল্প সময়ের জীবনে মানুষের জীবনের শোষণ বঞ্চনা সংগ্রাম ইতিহাস, মানুষের উপর শাসকদের অন্যায়-অবিচার, অত্যাচার-নির্যাতন-অন্যায্যতা নিয়ে অসংখ্য সিনেমা ও সাহিত্য রচনা করেছেন। দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য জহির রায়হানের জীবন ও কর্ম এক বিরল ছোটগল্প রূপে চিহ্নিত করা যায়। দুঃখজনক সত্য হলো এমন একজন মানুষ পরাধীন পূর্ব বাংলায় ভিনদেশী শাসক ও লুটেরাদের বিরুদ্ধে অক্লান্ত ও অসংখ্য প্রতিবাদী শিল্প সাহিত্য সৃষ্টি, লেখালেখি করা সত্ত্বেও এবং সক্রিয় রাজনৈতিক তৎপরতা জারি রেখেও বেঁচে ছিলেন।

কিন্তু বাঁচতে পারলেন না স্বাধীনতার পর স্বাধীন বাংলাদেশে।

৩০শে জানুয়ারী, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি এক ভয়ঙ্কর ট্রাজেডির দিন। ১৯৭২ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশে জহির রায়হানকে পরিকল্পিতভাবে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে চিরতরে গুম করে দেয়া হয়। এটিই সম্ভবত স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে প্রথম গুম ঘটনা।[*]

 

বাঙলাদেশের জাতীয় জীবনে এবং যেকোন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে বিতর্ক হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া একটা জাতীর জীবনে এটা খুবই স্বাভাবিক প্রবণতা। কিন্তু এই প্রশ্নে দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষশক্তি বলে দাবীদার, শুধু দাবীদারই না, তারা মুক্তিযুদ্ধে নিজেরা ছাড়া দেশের অন্য কোন পক্ষের অংশীদারিত্ব ও অবদান স্বীকার করতেও সম্পূর্ণরূপে অনিচ্ছুক। মুক্তিযুদ্ধ যেন তাদের দলীয়, পারিবারিক এমনকি পৈত্রিক সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি জনগণের ভূমিকাও তারা অস্বীকার করেন। তাদের অনেক বাজারী বুদ্ধিজীবি এও বলে থাকেন যে- “বঙ্গবন্ধু এক অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন”।

 

ভেবে দেখেন- ‘এনে দিয়েছেন!’

যেনো কোন পক্ষ তৈরী করে রেখেছিল, তিনি এনে দিয়েছেন! দেশে লুট চাঁদাবাজি ঘুষ দুর্নীতি মজুতদারী পাচার, জনগণের ব্যক্তিগত সহায় সম্পত্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও সরকারী সম্পত্তি, বন জঙ্গল নদী নালা খাল বিল, খাস ভূমি ইত্যাদি লুটে নেয়া যেন তাদের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত কোন অধিকার!

 

সুদীর্ঘ ৫০ বছর পরেও পূর্ববঙ্গের মানুষের মুক্তিযুদ্ধের লড়াই সংগ্রাম নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি, এখনো এই প্রশ্নে সমগ্র জাতীয় চেতনার কাঠামোতে বহু প্রশ্ন অমীমাংসিত। দীর্ঘ ৫০ বছর পর, এই প্রশ্ন নিয়ে পক্ষ বিপক্ষ রাজনীতি এক নগ্ন রাজনীতি বানিজ্যে রূপ পরিগ্রহ করেছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলা সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ এবং এই প্রশ্ন নিয়ে দেশে কোন প্রকার আলোচনা সমালোচনা ও গবেষণা যাতে হতে না পারে, সেই প্রয়োজনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয়ভাবে তা দমন করতে চায়। কেন?

 

পাকিস্তান রাষ্ট্র ও পাঞ্জাবী শাসকদের শোষণ শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের মানুষের স্বাধিকার আন্দোলনকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উন্নীত করার প্রশ্নে তৎকালীন আওয়ামী লীগ ও তার নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে আলাদা বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার প্রশ্নে স্বশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের অবসান করতে হলে উত্থাপিত সকল প্রশ্নের মীমাংসারও কোন বিকল্প নেই। এই যুদ্ধে কার কি ভূমিকা ছিল, চরিত্র ছিল, এই প্রশ্ন নতুন নয়। একেবারে গোড়ার কথা। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের দলীয় ভূমিকা কি ছিল? তাদের নেতৃত্বের ভূমিকা কি ছিল? তারা কে কোথায় কোন যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন?

 

অবিভক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে মাঠে ময়দানে জনগণকে স্বাধীনতার আকাঙ্খায় উজ্জিবিত করা, আর আসল সময়ে জনগণকে শত্রুর আক্রমণের মুখে ফেলে নিজেকে শত্রুর হাতে তুলে দেয়ার কৌশলটা কি? এই কৌশলের দ্বারা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে কোন শক্তি লাভবান হয়েছে? শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মসমর্পণের পর কোন উপায়ান্তর না পাওয়া আওয়ামী লীগের জাতীয় নেতৃত্ব কর্তৃক নিজেদেরকে ভারত রাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়াতে কারা লাভবান হয়েছে? ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের হাত থেকে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষমতা হাতে পেয়ে এখানে ভারত রাষ্ট্র কী ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়েছিল? ১৯৭২ সাল থেকে আজ ২০২১ সাল পর্যন্ত বাঙলাদেশের রাজনীতি অর্থনীতি সংস্কৃতিক্ষেত্রে ভারত রাষ্ট্রের ভূমিকা কী? আমরা পাকিস্তানী শোষণ শাসন ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ভারতের গোলাম হতে চাইনি। চেয়েছিলাম?

 

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার আজ ৫০ বছর পরে এসেও এই সকল প্রশ্ন কেউ তোলেন না। কেউ তোলে না। রাজনীতিতে সামাজিকভাবে এই প্রশ্ন তোলা নিষিদ্ধ। বিরাজমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় বা গোষ্ঠীগতভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার সাধারণ ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে জনগণকে লুট করা, অথবা লুটের মালের ভাগিদার হওয়া।

 

এটা এমন এক পরিস্থিতি যে, দেশের প্রবীন যারা সকল বিষয়ের প্রত্যক্ষদর্শী তারাও এমনকি সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট সমাজ বিরোধী অপশক্তির দ্বারা রাজনৈতিকভাবে আক্রান্ত হয়েও মুখ ফুটে সত্য প্রকাশ করছেন না।

 

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে এই প্রশ্ন যারা তুলতে পারতেন, তাদেরকে ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর সমূলে হত্যা করা হয়েছিল। শুধু ১৪ই ডিসেম্বর যাদেরকে হত্যা করা হয়েছিল তাই নয়, এর পরেও এই ধারা অব্যাহত ছিল এবং এখনও রয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ভূমিকা কি ছিল এই প্রশ্নে সবচেয়ে ভাল এবং দলিল দস্তাবেজসহ প্রমানসাপেক্ষে সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য উত্তর যিনি তৈরী করেছিলেন এবং তা জাতীর সামনে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন- তিনি ছিলেন জহির রায়হান।  

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের মহাপরাক্রমশালী শাসক হিসেবে বাংলাদেশের সর্বময় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার ১৫ দিন পর ১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জহির রায়হান ঘোষণা দেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনে নীলনকশা উদঘাটনসহ মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক গোপন ঘটনার নথিপত্র, প্রামাণ্য দলিল ইত্যাদি তার কাছে রয়েছে, যা প্রকাশ করলে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রীসভায় ঠাঁই নেয়া অনেক নেতার কুকীর্তি ফাঁস হয়ে পড়বে।

 

তিনি ঘোষণা দেন, আগামী ৩০ জানুয়ারি [১৯৭২] সন্ধ্যায় এই প্রেসক্লাবে তার ফিল্ম শো প্রমাণ করে দেবে কার কী ভূমিকা ছিল, চরিত্র ছিল।

 

১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারী আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেয়ার ৫ দিন পর ৩০শে জানুয়ারী তাকে পরিকল্পিতভাবে ডেকে নিয়ে চিরতরে গুম করে দেয়া হয়।

 

কারা এই কাজ করেছিল? কেনো করেছিল?

কী জানতেন তিনি? তা ফাঁস করে দিলে কার বা কাদের কী অসুবিধা ছিল?

 

১৯৭২ সালের ২৫ শে জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে  সাংবাদিক সম্মেলনের ঘোষণা দেয়ার ঠিক পাঁচদিন পর ৩০শে জানুয়ারি রোববার সকালে [সেইদিন সন্ধ্যাবেলায়ই প্রেসক্লাবে তাঁর ফিল্ম শো হওয়ার কথা ছিল] রফিক নামের এক অজ্ঞাত টেলিফোন কল আসে জহির রায়হানের কায়েতটুলির বাসায়। টেলিফোনে জহিরকে বলা হয়েছিল, “আপনার বড়দা [শহিদুল্লাহ কায়সার] মিরপুর ১২ নম্বরে বন্দী আছেন। যদি বড়দাকে বাঁচাতে চান তাহলে এক্ষুণি মিরপুর চলে যান। একমাত্র আপনি গেলেই তাকে বাঁচাতে পারবেন।”

টেলিফোন পেয়ে জহির রায়হান দুটো গাড়ী নিয়ে মিরপুরে রওনা দেন। তাঁর সাথে ছিলেন ছোট ভাই মরহুম জাকারিয়া হাবিব, চাচাত ভাই শাহরিয়ার কবির [বর্তমানে খ্যাতনামা আওয়ামী চেতনাধারী সুশীল-বুদ্ধিজীবী], বাবুল [জহির রায়হানের শ্যালক/সুচন্দার ভাই], আব্দুল হক [পান্না কায়সারের ভাই], নিজাম ও পারভেজ।

মিরপুর ২ নং সেকশনে পৌঁছানোর পর সেখানে অবস্থানরত ভারতীয় সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী [ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট] এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে জহির রায়হানের টয়োটা গাড়ি [ঢাকা-ক-৯৭৭১] সহ থাকতে বলে অন্যদের ফেরত পাঠিয়ে দেন। তারপর জহির রায়হান আর ফেরত আসেননি।

 

“মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জহির রায়হান আগরতলা হয়ে কলকাতায় পৌঁছান। মুক্তিযুদ্ধের প্রচার কাজ সংগঠিত করার কাজে নিজেকে যুক্ত করেন এবং পাকিস্তানের গণহত্যা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য ‘স্টপ জেনোসাইড‘ নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরির উদ্যোগ নেন।

কিন্তু আইরনি হলো যুদ্ধে শরণার্থী শিবিরে মানুষের দূর্দশার চিত্র, কলকাতায় পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতাদের আরাম আয়েশের চিত্র তুলতে গিয়ে জহির রায়হান মুজিবনগর সরকারের রোষানলে পড়েন।

 

সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার চিত্র অমানুষিক পরিশ্রমের দ্বারা তিনি জীবনবাজি রেখে ধারণ করেছিলেন, কিন্তু কলকাতায় আওয়ামী লীগ নেতাদের কীর্তিকলাপের চিত্র ধারণ করতে যেয়ে তিনি বাঁধার মুখে পড়েন, লাঞ্ছনার মুখে পড়েন।

 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর তার প্রত্যক্ষ দালিলিক প্রমাণসমৃদ্ধ কাজ ‘স্টপ জেনোসাইড’ প্রামাণ্যচিত্র তৈরি ও মুক্তি দেয়ার সময় কলকাতায় আওয়ামীলীগ নেতারা বারবার জহির রায়হানকে বাধাগ্রস্থ করেছিলেন।

 

➧ এ সম্পর্কে জহিরের চাচাতো ভাই শাহরিয়ার কবির [বর্তমানে নগ্ন আওয়ামী বুদ্ধিজীবী] বলেন, “তিনি [জহির রায়হান] যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য ঢাকা ছেড়ে আগরতলা এবং পরে কলকাতা চলে যান। কলকাতায় তিনি প্রচার কাজ সংগঠিত করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি প্রবাসী আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পতিত হন এবং তাঁকে বিভিন্নভাবে নিগৃহীত হতে হয়। ‘স্টপ জেনোসাইড‘ ছবিটি নির্মাণের সময় আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁকে নানাভাবে বাধা দিয়েছে। বিভিন্ন সেক্টরে শ্যুটিং করতে দেয়নি, এমনকী কোন কোন সেক্টরে তাঁর গমন পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল। …[ছবি তৈরি হওয়ার পর] আওয়ামী লীগের নেতারা ছবি দেখে ছাড়পত্র না দেয়ার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সেন্সর বোর্ডকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন।”[°]

 

[°] তথ্যসূত্রঃ || জহির রায়হান | একুশে ফেব্রুয়ারী [ভূমিকাঃ শাহরিয়ার কবির] | পৃষ্ঠাঃ ১৩-১৬ | পল্লব পাবলিশার্স | আগস্ট, ১৯৯২ ||

 

➧ ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবিটি মুক্তি দেয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ১০ই সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে কলকাতায় পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবী ফজলুল হক তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে একটি চিঠি° লিখে প্রামাণ্যচিত্রটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে/ বন্ধের ব্যাপারে আবেদন জানান।

 

° সম্পূর্ণ চিঠিটি ছাপা আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্র [৩য় খণ্ড, পাতা- ১২৭, ১২৮, তথ্য মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার] গ্রন্থে।

 

➧ জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে নির্মল সেন লিখেছেন, “স্বাধীনতার ৪০ বছর পরেও একটি প্রশ্নের জবাব আমি পাইনি। প্রশ্নটি হচ্ছে- জহির রায়হানের ব্যাপারে বিভিন্ন মহলের নিস্পৃহ আচরণ। একটি মানুষ যে এভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। কেউ যেন তার খোঁজ রাখল না। আমরা ঘাতক দালাল নির্মূলের কথা বলি, গণআদালত করে গোলাম আযমের ফাঁসি দাবি করি। অথচ জহির রায়হানের নামটি চলচ্চিত্র জগৎ ছাড়া আর কোথাও উচ্চারিত হয় না। কেন হয় না, সে প্রশ্নের জবাব দেয়ার মতো কেউ এদেশে নেই। সাম্প্রতিককালে জহির রায়হান নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে নতুন তথ্য শোনা গেছে। বলা হয়েছে- পাকিস্তানি হানাদার বা অবাঙালিরা নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশই জহির রায়হানকে খুন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের এ অংশটির লক্ষ্য ছিল- বাংলাদেশকে স্বাধীন করা এবং সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থী বুদ্ধিজীবিসহ সামগ্রিকভাবে বামপন্থী শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়া। এরা নাকি বামপন্থী বুদ্ধিজীবিদের হত্যার একটা তালিকা প্রণয়ন করেছিল। এদের ধারণা এ তালিকাটি জহির রায়হানের হাতে পড়েছিল। জহির রায়হানও জানত তার জীবন নিরাপদ নয়। তবুও সে ছিল ভাইয়ের শোকে মূহ্যমান। তাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম শুনেই সে ছুটে গিয়েছিল মিরপুরে তারপর আর ফিরে আসেনি। এ মহলই তাকে ডেকে নিয়ে খুন করেছে। তাহলে কোনটি সত্য? জহির রায়হানকে কারা গুম করেছে? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা, আল বদর, আল শামস্, না রাজাকার? নাকি মুক্তিবাহিনীর একটি অংশ? স্পষ্ট করে বললে বলা যায়- মুক্তিবাহিনীর এ অংশটি মুজিব বাহিনী। ১৯৭১ সালে প্রবাসী স্বাধীন বাংলা সরকারের অজান্তে গড়ে ওঠা মুজিব বাহিনী সম্পর্কে অনেক পরস্পরবিরোধী তথ্য আছে। বিভিন্ন মহল থেকে বারবার বলা হয়েছে, এ বাহিনী গড়ে উঠেছিল ভারতের সামরিক বাহিনীর জেনারেল ওবান-এর নেতৃত্বে। এ বাহিনী নাকি মিজোরামে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে মিজোদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। এদের নাকি দায়িত্ব ছিল- রাজাকার, শান্তি কমিটিসহ বাংলাদেশের সকল বামপন্থীদের নিঃশেষ করে ফেলা। মুজিব বাহিনী সম্পর্কে এ কথাগুলো বারবার লেখা হচ্ছে। কোন মহল থেকেই এ বক্তব্যের প্রতিবাদ আসেনি। অথচ দেশে মুজিব বাহিনীর অনেক নেতা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে আছেন। তারা কোন ব্যাপারেই উচ্চবাচ্চ্য করছেন না। তাদের নীরবতা তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বক্তব্যই প্রতিষ্ঠিত করছে এবং সর্বশেষ জহির রায়হানের নিখোঁজ হবার ব্যাপারেও মুজিব বাহিনীকেই দায়ী করা হচ্ছে।” [°]

 

[°] তথ্যসূত্রঃ || নির্মল সেন | আমার জবানবন্দি | পৃষ্ঠাঃ ৪০৫-৪০৬ | ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ | ফেব্রুয়ারি, ২০১২ ||

 

➧ জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার মাস দেড়েক পর শহিদুল্লাহ কায়সার ও জহির রায়হানের বোন নাফিসা কবির, শহিদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার, জহিরের ২য় স্ত্রী সুচন্দাসহ ১৯৭১ সালে নিহত বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের অনেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করতে গেলে শেখ মুজিবুর রহমান সবাইকে বাড়ির গেটে অপেক্ষামান রাখেন। একসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গেটের সামনে এসে বিক্ষোভ ও দেখা করার কারণ জানতে চাইলে তাঁর সাথে নাফিসা কবিরের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়!

 

বঙ্গবন্ধু বলেন, “অনেকে ত দালালী করে মরেছে।”

 

নাফিসা কবির বলেন, “বুদ্ধিজীবীরা কেউ দালালী করে মরেনি। দালালী যারা করেছে তারা এখনও বেঁচে আছে। সে দালালদের বিচারের দাবী জানাতে এসেছি।”

[শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবার কল্যাণ পরিষদের পক্ষ থেকে শহীদুল্লাহ কায়সারের বোন এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে শেখ মুজিবের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়কালে][°]

 

[°] তথ্যসূত্রঃ || পান্না কায়সার | মুক্তিযুদ্ধঃ আগে ও পরে | প্রথম প্রকাশ-প্রথম সংস্করণ | পৃষ্ঠাঃ ১৬৮ | আগামী প্রকাশনী | ফেব্রুয়ারী, ১৯৯১ ||

 

➧ জহির রায়হান নিখোঁজের প্রায় এক বছর পর ১৯৭৩ সালের ২২ শে জানুয়ারি সাংবাদিক আহাম চৌধুরী ‘জহির রায়হান হত্যা রহস্য আর কতদিন ধামাচাপা পড়ে থাকবে‘ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলেছিলেন, “জহির রায়হান মিরপুর কলোনির অভ্যন্তরে যাননি। ক্যাম্প থেকেই তিনি নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন। কারা তাঁকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই খবরও কারো অজানা নয়। সরকার নিখোঁজ জহির রায়হান’কে খুঁজে বের করার কোন আন্তরিকতা দেখায়নি বরং জহির রায়হান নিখোঁজের রহস্য ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কতদিন থাকবে এই ধামাচাপা? ‘জহির রায়হানকে যে কোন উপায়ে আটকাতে হবে। তাঁর তদন্ত কমিটি ভেঙে দিতে হবে নতুবা তাঁকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দাও’ এই নির্দেশ খোদার গায়েবী আওয়াজের মতোই সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছিল। তাই জহির রায়হানকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে চিরদিনের জন্য। মুজিবনগরে যে ক’জন রুই কাতলার সাথে জহির রায়হানের চিন্তাধারার সাথে বচসা হয়েছিল জহির হত্যাকাণ্ডে তারাও নাকি জড়িত রয়েছেন। জহির হত্যার পরিকল্পনা ১৫ দিন ধরে করা হয়েছিল। জহিরকে তিরিশে জানুয়ারি খাঁচায় পুরে একত্রিশ তারিখে অন্য একটি স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়। সেখানে তাঁকে তদন্ত কমিটি ভেঙে দেয়ার আহবান জানানো হয়। বুদ্ধিজীবী হত্যার তদন্তের চিন্তা না করে ভাতের চিন্তা করতে বলা হয়। জহির রায়হানের হত্যাকারী দল আরও একদিন তাঁকে চিন্তা করার সময়ও নাকি দিয়েছিলেন – আর সেদিনটি নাকি ছিল উনিশ’শ বাহাত্তর সালের দ্বিতীয় মাসের প্রথম দিন যথা সর্বনাশা ফেব্রুয়ারির সর্বনাশা মঙ্গলবার।”

 

➧ ১৯৯২ সালের ১লা মে তারিখে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন শাহরিয়ার কবির। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে সত্যজিত রায় শাহরিয়ার কবিরকে হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করলেন, “জহিরের ব্যাপারটা কিছু জেনেছো?

 

শাহরিয়ার কবির জবাব দেন, “তাকে সরিয়ে ফেলার পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা ব্যক্তিগতভাবে তদন্ত করে যা বুঝতে পেরেছি তাতে বলা যায়, ৩০ জানুয়ারি দুর্ঘটনায় তিনি হয়তো মারা যাননি। তারপরও দীর্ঘদিন তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।”

 

-- স্ট্রেঞ্জ! জহিরকে বাঁচিয়ে রাখার পেছনে কারণ কী?

 

-- সেটাই ষড়যন্ত্রের মূল সূত্র বলে ধরছি। মিরপুরে দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হলে গভীর ষড়যন্ত্র মনে করার কোনো কারণ ছিল না। আমি যতদূর জানি, বুদ্ধিজীবীদের হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন যা অনেক রথী-মহারথীদের জন্যই বিপজ্জনক ছিল, সে জন্য তাকে সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন ছিল।

 

➧শুধু তাই নয় শাহরিয়ার কবির আরেকটি গ্রন্থে জহির রায়হানের অন্তর্ধান সম্পর্কে বলেছিলেন-

 

“৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর শহিদুল্লাহ কায়সারের মৃত্যুর সংবাদ শুনে জহির রায়হান একেবারেই ভেঙ্গে পড়েন। … বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি করে হানাদার বাহিনীর সহযোগী বহু চাঁই ব্যক্তির নাম সংগ্রহ করলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে বললেন তিনি শ্বেতপত্র প্রকাশ করবেন। বুদ্ধিজীবিদের হত্যার জন্য তিনি আওয়ামী নেতৃত্বকেও দায়ী করেন। মুজিবনগর সরকারের সকল গোপন তথ্য ফাঁস করে দেবেন বলেও ঘোষণা করেন। … তাঁর উপস্থিতি যাদের জন্য অস্বস্তিকর তারা এই পরিস্থিতির সুযোগ নেবে এটা খুব স্বাভাবিক। ৭২ এর ৩০শে জানুয়ারি মিরপুরে তাঁর অগ্রজকে [শহিদুল্লাহ কায়সার] খুঁজতে গিয়েছিলেন। তদন্ত করলে হয়ত জানা যেতো সেই অজ্ঞাত টেলিফোন কোত্থেকে এসেছিল, যেখানে তাঁকে বলা হয়েছিল শহিদুল্লাহ কায়সার মিরপুরে আছেন। … এটাও বিস্ময় যে তাঁর [জহির রায়হানের] অন্তর্ধান নিয়ে কোন তদন্ত হয়নি। কেন হয়নি অনুমান করতে অসুবিধে হয় না।” [°]

 

[°] তথ্যসূত্রঃ || জহির রায়হান | একুশে ফেব্রুয়ারী [ভূমিকাঃ শাহরিয়ার কবির] | পৃষ্ঠাঃ ১৩-১৬ | পল্লব পাবলিশার্স | আগস্ট, ১৯৯২ ||

 

 

➧ জহির রায়হানের সন্তান অনল রায়হান ১৯৯৯ সালে ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ ম্যাগাজিনে ‘পিতার অস্থির সন্ধানে পুত্র‘ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, “৪ঠা ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ এ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত ‘জহির রায়হানের খোঁজ চলছে … রহস্যজনক ফোন আসছে’ শিরোনামে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে “বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে নিখোঁজ জহির রায়হানের অনুসন্ধানের জন্য মিরপুরে ব্যাপক তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু, রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ, মিত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরা আলাদাভাবে দুটো বৈঠকে মিলিত হন। …অথচ এরমধ্যেও আসছে টেলিফোনে অজ্ঞাত পরিচয়ে নানা মহলের হুমকি”।

 

জহির রায়হান খুনের পিছনের রাঘব বোয়ালকে চিনতে আরও কিছু সূত্র।

 

➧ দৈনিক আজকের কাগজ ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩ সংখ্যা ‘জহির রায়হানের হত্যাকারী রফিক এখন কোথায়‘ শীর্ষক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে ‘রাহুর কবলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি‘ গ্রন্থে সরকার সাহাবুদ্দিন আহমদ লিখেছেন, “আজকের কাগজের ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩ সংখ্যায় ‘জহির রায়হানের হত্যাকারী রফিক এখন কোথায়‘ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জহির রায়হান নিখোঁজ এই নিয়ে লেখালেখি হলে একদিন বড়দি অর্থাৎ জহির রায়হানের বড় বোন নাফিসা কবিরকে ডেকে নিয়ে শেখ মুজিব বললেন, ‘জহিরের নিখোঁজ নিয়ে এরকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে!’

 

প্রশ্ন হচ্ছে যে, জহির রায়হানের মতো একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা স্বাধীনতার পর নিখোঁজ হয়েছে এটা নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি হওয়াটাই স্বাভাবিক। জহির রায়হান তাঁর বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মিরপুরে খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হন। সম্ভবত তাকে হত্যা করা হয়েছিল। সুতরাং তার হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে তার আত্মীয়-স্বজন সোচ্চার হতেই পারেন। কিন্তু শেখ মুজিব কেন জহির রায়হানের বড় বোনকে ডেকে নিয়ে নিখোঁজ করে ফেলার হুমকি দিলেন! কী রহস্য ছিল এর পেছনে? তাহলে কি বুদ্ধিজীবী হত্যার ব্যাপারে শেখ মুজিব এমন কিছু জানতেন, যা প্রকাশ পেলে তার নিজের কিংবা আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতির কারণ হতো? আর কেনইবা তড়িঘড়ি করে জহির রায়হানের তথাকথিত হত্যাকারী রফিককে সপরিবারে আমেরিকা পাঠিয়ে দেয়া হলো? কে ছিলেন এই রফিক? কী তার রাজনৈতিক পরিচয়?” [°]

 

[°] তথ্যসূত্রঃ || সরকার সাহাবুদ্দিন আহমদ | রাহুর কবলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি | পৃষ্ঠাঃ ১০৮ ||

 

➧ এ ব্যাপারে সুমিতা দেবীর বক্তব্য, “জহির রায়হান নিখোঁজ এই নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বেশ লেখালেখিও হলো। একদিন বড়দি অর্থাৎ জহিরের বড় বোন নাসিমা কবিরকে ডেকে নিয়ে শেখ মুজিব বললেন, জহিরের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে এ রকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে। পরে নাসিমা আর কিছু বলেনি। টেলিফোন করেছিল যে রফিক, তাকে নিয়ে যখন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হলো। তখন তাকে নাগরিকত্ব দিয়ে পুরো পরিবারসহ আমেরিকায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। এই ঘটনা জহিরের নিখোঁজ হওয়ার সম্পর্কে রফিকের ভূমিকাকে আরো সন্দেহযুক্ত করে তোলে আমার কাছে।” [°]

 

[°] তথ্যসূত্রঃ || সুমিতা দেবী | দৈনিক আজকের কাগজ | ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩ ||

 

➧ ৯ আগস্ট ১৯৯৯ দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় জহির রায়হানের মেজো সন্তান অনল রায়হানের অভিযোগ। তিনি অভিযোগ করেন, “জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার এক ভুয়া তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। এই কমিটি কোনো কাজ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের প্যানপ্যানানি করে আওয়ামী লীগ সরকার আবার ক্ষমতায় এলো …মুজিব হত্যার বিচার হচ্ছে। এই হত্যাকান্ড ঘটেছে ১৯৭৫ সালে। এর আগে জহির রায়হানসহ অনেক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছে। কই তাদের তো বিচার হলো না।”


➧ শহীদ সেলিমের মায়ের মতে, “বঙ্গভবনের ওর ঘর থেকে যে প্রয়োজনীয় কাগজগুলো উধাও হয়েছিল সেগুলো সম্ভবত তদন্ত কমিটির গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রই হবে। খোদ বঙ্গভবন থেকে জিনিসপত্র উধাও হয়ে যাবে তা ভাবতেও বিশ্বাস হয় না। শহীদ সেলিম বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তের কাজে সরাসরি জড়িত ছিলেন একথা আমি আগে জানতাম না। আমি কেন, আর কেউ জানে কিনা তাও জানি না। জহির রায়হান ও সেলিমের নিখোঁজ রহস্য এখন আমার কাছে আরও রহস্যজনক বলে মনে হচ্ছে। বুদ্ধিজীবী হত্যা যেমন ৭১ সালে গুরুত্বের সঙ্গে উদঘাটিত হয়নি, তেমনি জহির রায়হান নিখোঁজ রহস্যও গুরুত্বের সঙ্গে উদঘাটিত করার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করেনি। অথচ এটা একটা গভীর ষড়যন্ত্র। যে ষড়যন্ত্রের বিষবৃক্ষের বীজ রোপণ হয়েছিল সেদিন।” [°]

 

[°] তথ্যসূত্রঃ || দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ | বাংলা ১০ই জৈষ্ঠ্য ১৩৯৯ | ২৪শে মে, ১৯৯২ ||

 

➧ জহির রায়হানের ভাবী এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য পান্না কায়সার নিজেই বলেছেন যে, “খোদ বঙ্গভবন থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উধাও হয়ে যাবে সেটা ভাবনারও অতীত। জহির রায়হানের সাথে লেফটেন্যান্ট সেলিমও বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তে সরাসরি জড়িত ছিলেন। এ সম্পর্কিত কাগজপত্র জহির রায়হান এবং সেলিম উভয়ের কাছ থেকেই উধাও হয়ে গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রেসিডেন্টের ভবন থেকে কাগজপত্র উধাও করতে পারে কারা? ‘রাজাকার’ বা ‘পাকিস্তানপন্থীরা’ অবশ্যই নয়। এটা করা সম্ভব একমাত্র তাদের পক্ষে, যারা ক্ষমতার আশপাশে ছিলেন।” [°]

 

[°] তথ্যসূত্রঃ || দৈনিক ‘বাংলার বাণী’ | বাংলা ১০ই জৈষ্ঠ্য ১৩৯৯ | ২৪শে মে, ১৯৯২ ||

 

➧ জহির সম্পর্কে বলতে গিয়ে জহির রায়হানের স্ত্রী সুচন্দার ছোট বোন নায়িকা ববিতা উল্লেখ করেছেন, “ভারত থেকে ফিরে আসার পর একবার এক মিটিংয়ে উনি বলেছিলেন ‘যুদ্ধের নয়মাস আমি কলকাতায় ছিলাম। আমি দেখেছি সেখানে কে কি করেছে। কে দেশের জন্য করেছে, আর কে নিজের আখের গুছিয়েছে। আমার কাছে সব রেকর্ড আছে। আমি সব ফাঁস করে দেব।’ এটাই জহির রায়হানের জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এজন্যই জহিরকে ফাঁদে ফেলে মিরপুর নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরিকল্পনামাফিক তাকে সরিয়ে দেয়া হয় পৃথিবী থেকে।” [°]

 

[°] তথ্যসূত্রঃ || ‘আনন্দ ভুবন’ এর ১৬ মার্চ, ‘১৯৯৭ সংখ্যায় ‘কুলায় কালস্রোত’ বিভাগে শিরোনাম ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ ||

 

➧ বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও প্রখ্যাত লেখক; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর; এবনে গোলাম সামাদের ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে’ শীর্ষক লেখায় তিনি বলেছেন, “চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হানের সঙ্গে আমার কলকাতায় পরিচয় ঘটে। তার থাকবার কোন জায়গা ছিল না প্রথমে। আমি তাকে তিন মাসের জন্য থাকবার একটা খুব ভাল ব্যবস্থা করে দিতে পেরেছিলাম কলকাতায়। দেশে ফিরবার পর তিনি মারা যান।

 

...৭ ডিসেম্বর [৭১] কলকাতায় বাংলাদেশ দূতাবাসে একটি উৎসব হয়। রায়হান সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমিও ছিলাম। তিনি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসেবে ছিলেন আমার দু’সারি আগে। হঠাৎ তাকে বলতে শুনি ‘দেশকে দু’বার স্বাধীন হতে দেখলাম। আবার একবার স্বাধীন হতে দেখবো কিনা জানি না।’

কেন তিনি এ ধরনের মন্তব্য করেছিলেন, তা ভেবে আমার মনে পরে অনেক প্রশ্ন জেগেছে। তার মৃত্যু আজো হয়ে আছে রহস্যঘেরা।


জহির রায়হানের উপরোক্ত মন্তব্যে দেখা যায়, তিনি ৪৭ সালে ইংরেজদের বিদায়, ভারতবর্ষ বিভক্তি, পাকিস্তানের জন্মকেও স্বাধীনতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তার চেয়েও বেশি তাৎপর্যমণ্ডিত ব্যাপার হলো, মওলানা ভাসানীর অনুসারী জহির খুব সম্ভব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ভবিষ্যতে ভারতের আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদ কবলিত হওয়া এবং তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে জনগণের আরেকবার বিজয় অর্জনের দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। আর এই ইঙ্গিতে ভারতপন্থী মহল এবং তাদের গুরুদের গা-জ্বালা ধরে যাওয়াই স্বাভাবিক। তখনকার পরিস্থিতিতে খোদ কলকাতায় বসে প্রকাশ্যে এমন উক্তি করা তাদের কাছে ‘স্পর্ধা’ বলে মনে হতে পারে। হয়তো এই দুঃসাহসের মূল্য হিসেবেই জহিরকে জীবন দিতে হয়েছে। আমার বিশ্বাস জহির মিরপুরে মারা যায়নি। ঘাতকরা তাকে অন্য কোথাও হত্যা করেছে। এ বিশ্বাস এখনো আমার আছে।”

ফলতঃ এই গুম-খুন-ক্রসফায়ারের মতো রাষ্ট্রীয় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আর মানবতাবিরোধী অপরাধের যে রাজনৈতিক ক্ষমতাচর্চার সংস্কৃতি, তা অধুনা নতুন কিছু না!


এর শুরু সেই স্বাধীনতার পর থেকে স্বাধীনতার স্বপক্ষশক্তির হাত ধরেই হয়েছে; যারা সগর্বে  বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দেয়ার দাবি করে থাকে।

অথচ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষণ, অত্যাচার-জুলুম-নির্যাতন আর অন্যায় বৈষম্যের হাত থেকে মুক্তির স্বপ্ন আর সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের মতো রাষ্ট্রীয় আদর্শিক ভিত্তির প্রতিজ্ঞা বুকে নিয়েই এ দেশ স্বাধীন হয়েছিলো।


কিন্তু স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই প্রতিটি স্বপ্ন হয়েছে ভূলুণ্ঠিত আর আদর্শিক ভিত্তি হয়েছে বিপন্ন-বিলুপ্ত।

স্বাধীনতার ঠিক পরপরই সে সময়ও চেতনা আর উন্নয়নের নামে হয়েছে এখনকার মতোই দেদারসে লুটপাট-দুর্নীতি আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং জনগণের দেয়া রাজস্বের টাকার হরিলুট। যারই ধারাবাহিক ফলশ্রুতিতে হয়েছিলো শতাব্দির অন্যতম ও স্বাধীন বাংলার প্রথম দুর্ভিক্ষ!

ঠিক একইভাবে যেভাবে হয়েছিলো বর্তমানে গুমের সংস্কৃতির ঐতিহাসিক পটভূমিতে জহির রায়হান, স্টুয়ার্ট মুজিব কিংবা স্বপন কুমার চৌধুরীর পরিকল্পিত অন্তর্ধান!

বর্তমানে হরহামেশাই ক্রসফায়ারের যে ঐতিহাসিক সিলসিলাহ্ শুরু হয়েছিলো সিরাজ সিকদারকে হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যার মাধ্যমে।

বর্তমানে রাজনৈতিক বিরোধীদল কিংবা বিপক্ষ রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকদের হত্যার যে রক্তাক্ত পথচলা শুরু হয়েছিলো জাসদ এবং তৎকালীন রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রায় ৩৪ হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যার মাধ্যমে।


জনসভা করে ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে হাজার হাজার মানুষের সামনে উন্মুক্ত রাজপথে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ মেরে লাশের ওপর তাণ্ডবনৃত্য করে পাশবিক উল্লাসের শুরুটাও সেই সময় থেকেই যখন রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা পিতার হাতে কুড়াল দিয়ে নিজের পুত্রের গর্দান কেটে দিতে বাধ্য হয়েছিলো; যা নিয়ে রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা চেতনার নামে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ফুটবল খেলতে খেলতে জান্তব উচ্ছ্বাসে উদযাপন করেছিলো।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মাওলানা ভাষানীর গ্রহবন্ধীর ঐতিহাসিক চিঠি